Header Ads Widget

Responsive Advertisement

সাধারণ বিমায় ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া, আটকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা



দেশের সাধারণ (নন-লাইফ) বিমা খাতে এক ধরনের নীরব সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দেশে ব্যবসা করা অধিকাংশ সাধারণ বিমা কোম্পানি গ্রাহকদের ঠিকমতো বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানিতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি দাবি বকেয়া পড়েছে। এই বকেয়া দাবির হার ৭৫ শতাংশ। বিমা কোম্পানি দাবির টাকা পরিশোধ না করায় সৃষ্টি হয়েছে আস্থার সংকট। এরই মধ্যে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিমা করা বন্ধ করে দিয়েছে।

বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানিতে বিমা দাবি উত্থাপন হয় ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো দাবি পরিশোধ করেছে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ২৫ শতাংশ। বিপরীতে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে।

AD1

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেই গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। তবে ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া পড়ার জন্য মূল দায়ী সাধারণ বিমা করপোরেশন। অনেক কোম্পানি সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে পুনঃবিমার টাকা ঠিকমতো পাচ্ছে না। ফলে গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তারা বলছেন, গ্রাহকরা ঠিকমতো দাবির টাকা না পাওয়ায় এ খাতে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সামনে গ্রাহক ও ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশে ব্যবসা করা একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিমা করা বন্ধ করে, মূল কোম্পানি যে দেশের সেই দেশের বিমা কোম্পানিতে বিমা করছে।

অন্যদিকে, সাধারণ বিমা করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সঠিকভাবে তথ্য-প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে পুনঃবিমার টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। সাধারণ বিমা করপোরেশনে বর্তমানে কোনো ধরনের সংকট নেই। মূলত কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেওয়ায় টাকা পাচ্ছে না।
বড় কোম্পানির কাঁধে বকেয়ার বড় চাপ

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বিমা করপোরেশনে সবচেয়ে বেশি বিমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বকেয়া দাবি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন হয়। এর মধ্যে মাত্র ২৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা ১২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ পরিশোধ করা হয়েছে। পুরো খাতের বকেয়ার বড় অংশই এই একটি প্রতিষ্ঠানের।

AD2

গ্রাহকরা ঠিকমতো দাবির টাকা না পাওয়ায় এ খাতে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সামনে গ্রাহক ও ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একইভাবে বেসরকারি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সেও বড় অঙ্কের বিমা দাবি বকেয়া পড়েছে। ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকা দাবির মধ্যে কোম্পানিটি মাত্র ৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ৮২ শতাংশ পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া পড়েছে ৩২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বা ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশ।

রিলায়েন্স ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্সেও শত কোটি টাকার ওপরে দাবি বকেয়া পড়েছে। এর মধ্যে রিলায়েন্স ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া পড়ে রয়েছে ১৪০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া রয়েছে ১৩০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
চার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা উদ্বেগজনক

AD3

চারটি সাধারণ বিমা কোম্পানির দাবি পরিশোধের হার খুবই উদ্বেগজনক। এই কোম্পানিগুলোতে ৯০ শতাংশের বেশি দাবি বকেয়া পড়েছে। এর মধ্যে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১ কোটি ১২ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, কোম্পানিটিতে ২৬ লাখ ৫৭ টাকা বা ৯৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ দাবি বকেয়া রয়েছে।

পিপলস ইন্স্যুরেন্স ৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৬ কোটি ৯ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, দাবি বকেয়া রয়েছে ৮৮ কোটি ৬ লাখ টাকা বা ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার মধ্যে ৪ কোটি ৯৬ লাখ বা ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, কোম্পানিটির বকেয়া দাবির পরিমাণ ৬৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা বা ৯৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। বাংলাদেশ কো-অপারেটি ৭ কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৫৬ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, বকেয়া দাবি রয়েছে ৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৯২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

এ চার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে বেশ খারাপ অবস্থার রয়েছে। এর মধ্যে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ১৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠনটি ৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া রয়েছে ২৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। কোম্পানিটি ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া রয়েছে ১৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে, বিপরীতে বকেয়া ২৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। দাবি পরিশোধের হার ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে এবং বকেয়া ১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। দাবি পরিশোধের হার ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।

AD4

এছাড়া অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া ৭ কোটি ২ লাখ টাকা। গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ২২ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে এবং বকেয়া ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। মেঘনা ইন্স্যুরেন্সে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দাবি পরিশোধ করেছে। বিপরীতে বকেয়া ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি পরিশোধের হার ২৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ